![]() |
| কবি সুবীর সরকার |
![]() |
| কবি সোনালি বেগম |
মাসিক ছোট কবিতা, জুলাই ২০১৬ "রূপসী বাংলা" সংখ্যার আলোচ্য কবি সুবীর সরকার এর এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন কবি সোনালি বেগম। প্রিয় দুই কবির প্রতি "ছোট কবিতা"-র পক্ষ থেকে নান্দনিক শুভেচ্ছা।
সোনালি বেগমঃ বাংলা সাহিত্যের সাথে অনেকদিন ধরেই ভালোভাবে যুক্ত আছো। কবিতা ও গদ্য দুইই সমান্তরালে লিখে চলেছো। এই যে এতদিন ধরে লিখছো, তোমার লেখনিকে প্রভাবিত করেছে এমন এক বা একাধিক ভাললাগা মূহুর্তের কথা যদি শেয়ার কর।
সুবীর সরকারঃ আসলে আমি একটা বর্ণময় ও অলৌকিক বাল্যকাল পেয়েছিলাম। গান ও নাচের সে এক দিন-দুনিয়া। লোকজীবনের মায়ায় বেড়ে উঠছিলাম। আর গ্রামের বাড়িতে পিতামহ পিতামহী জ্যাঠামশাইয়ের কাছে নানান সব গাথা ও গল্প শুনেছিলাম। সে সব আমাকে স্বপ্ননির্মাণ করতে উস্কে দিয়েছিল। আমার পিতামহ রামায়ণ মহাভারত পড়তেন রোজ বিকেলে। প্রচুর পাড়াপড়শি আসতেন। সুর করে পড়তেন। দুলতেন। সে সব আমাকে সংক্রামিত করতো। আর জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে যেতাম বাড়ির পাশের চা-বাগান ও চিলাপাতার জঙ্গলে।ফেউ এর ডাক শুনতাম। কখনো মধ্যরাতে হাতির পাল ঢুকতো আমাদের ধানক্ষেতে। আমি হাতি তাড়াবার দলে ভিড়ে যেতাম। আর ভাই বোনেরা মিলে খেলতাম নানান গ্রামীণ খেলা। মথুরায় বড় হাট বসে সোমবারে। সারাদিন ঘুরতাম হাটের অন্দরে কন্দরে। কত কত বিচিত্র মানুষ দেখতাম। চা-বাগানের মদেশিয়া কামিন্দের দেখতাম। মোরোগলড়াই। পাশা খেলা। এই সব অবচেতনে আমাকে লেখার জীবনে, অভিশাপের জীবনে টেনে এনেছে ।
সোনালিদিঃ internet-এ অসংখ্য web magazine তোমার লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছে। মুদ্রিত ম্যাগ আর web magazine-এর কবিতা। তোমার কিছু বলার আছে কি?
সুবীরঃ আসলে বালিশে আরাম করে পত্রিকা পড়া আমার খুব প্রিয়। কিন্তু এটাও দেখবার যে মুদ্রিত ম্যাগ ৩০০ কপি ছাপা হয়। সেখানে পাঠক সীমাবদ্ধ। কিন্তু web magazine সারা জায়গার পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারে। কাজেই web magazine ও মুদ্রিত ২ টিই আমার কাছে গুরুত্ব পায়।
সোনালিদিঃ তুমি কবিতা লেখো কেন? কবিতার জন্ম তোমার কাছে কিভাবে হয়? তাৎক্ষণিক, না কি ভেবেচিন্তে?
সুবীরঃ না না। আমি বিশ্বাস করি তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা লেখা যায় না। ভেবেচিন্তেও না। আসলে কবিতা জড়িয়েই তো বাঁচি আমি। থাকি আমি। কবিতাকে আসতে দেই আগে। তারপর…শুরুয়াত…আর কবিতা লিখি কেন…তার কোন উত্তর হয় না…হয়তো এটুকুই পারি আমি। মানে কবিতা লেখার প্রয়াস…
সোনালিদিঃ কবিতায় পোষ্ট মডার্নিজম কিভাবে দেখো? তুমি কি কখনো তোমার কবিতায় POST MODERN চিহ্নগুলি খুঁজে পেয়েছো? বা ব্যাবহারে উৎসাহবোধ করেছো?
সুবীরঃ আসলে আমি সেভাবে ভেবে তো কোন তত্ত্বকে অনুসরণ করি না। তবে POST MODERN এর বহুরৈখিকতাকে আমি আমার কবিতায় আনবার আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়েছি বারবার। কিন্তু কখনোই আমি POST MODERN ঘরাণার কবি নই। আমি বিশ্বাস করি কবি তার নিজের মতন লিখবেন। কোন তত্ত্বকে অনুসরণ না করে।
সোনালিদিঃ তোমার কবিতা প্রবাহিত নদীর মতন, কিংবা উদার নীল আকাশের মত সহজ-সরল প্রকৃতি, প্রেম ঠাসা। এই যে জীবনবোধ__কি বলবে তুমি।
সুবীরঃ আসলে বাল্য থেকেই আমায় একটা প্রশ্ন কুড়ে কুরে খায়। সেটা হল…’আচ্ছা, মানুষ বেঁচে থাকে কেন? আস্ত এক জীবন নিয়ে কি করে মানুষ’! এই জিজ্ঞাসা তুমুল তাড়িত করেছে আমাকে সবসময়। না কি স্মৃতি থেকে পালাতে চায় মানুষ! এই সব আমাকে বিক্ষত করে। আর আমি কবিতায় নিজেকে ডুবিয়ে দেই।
সোনালিদিঃ সময়সুযোগ পেলেই উত্তরবঙ্গের নানান জায়গা অথবা বাংলাদেশ ঘুরতে যাওয়া,তোমার নামের সঙ্গে একদম সমার্থক হয়ে উঠেছে। কি সেই ভালোবাসা যা তোমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় – একটু বল।
সুবীরঃ আসলে আমি খুব জমজমাট একটা জীবন যাপন করতে চাই। খুব ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে । মানুষজন জনপদ আঞ্চলিক নদী নিসর্গ হাটগঞ্জ প্রান্তিকজনমানুষের পৃথিবী প্রবল টানে আমাকে। আমার উত্তরজনপদ আমাকে আঁকড়ে থাকে। আর বাংলাদেশে আমার বন্ধুরা আছেন, বাংলাদেশের প্রকৃতির স্নিগ্ধতার এক মায়া আছে, ওখানকার তীব্র আন্তরিকতার টানে আমি বাংলাদেশে যাই। ঘুরে বেড়াই। কোন কবিতা পাঠের আসরের টানে কিন্তু যাই না। এই যাপনটাই তো আমাকে পূর্ণ করে, তাড়িত করে, শুদ্ধ করে। উস্কে দেয় তুমুলও।
সোনালিদিঃ অবসর সময় কীভাবে কাটাতে চাইবে? পরিবার, বন্ধু নাকি কবিতা লেখা?
সুবীরঃ পরিবার,বন্ধু ও কবিতার মধ্যে তো কোন ব্যাবধান বা বিরোধ নেই। আমি তুমুল বোহেমিয়ান আবার প্রবল পারিবারিক। তবে আমার সবসময়ই ব্যস্ততা আবার সর্বদাই অবসর। যাই হোক…পড়া আর পড়া, গান শোনা আর ঘুরে বেড়ানোর জীবনেই আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি।আর পরিবার তো আমার কাছে বটগাছের ছায়ার আর মায়ার আরাম।
সোনালিদিঃ বর্তমানে সাহিত্যের তথ্যপ্রযুক্তির যুগ চলছে। তুমি কতটা আশাবাদী।
সুবীরঃ তথ্যপ্রযুক্তিকে আমি আশীর্বাদ বলে মনে করি। স্বাগত জানাই। সাহিত্যে তথ্যপ্রযুক্তিকে না ব্যবহার করতে পারলে তো অনেক পেছনে পরে থাকতাম আমরা। সাহিত্যের পাঠক, নানান প্রান্তের চর্চার খবর, বিশ্বের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ মিলতো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে তথ্যপ্রযুক্তির কাছে ঋণী। লাটিন আমেরিকার পাশাপাশী বাংলাদেশ অসম ত্রিপুরার সাম্প্রতিক সাহিত্য চর্চার খবর কি জানতে পারতাম তথ্যপ্রযুক্তি না থাকলে! এখন প্রচুর ভালো বইএর সফট কফি পাওয়া যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির জন্যই। তো, আমি চূড়ান্ত আশাবাদী।
সোনালিদিঃ বর্তমানে যে সমস্ত তরুন লেখকেরা লিখছেন,তাদের জন্য কোন বার্তা দিতে চাও?
সুবীরঃ কাউকে বার্তা দেবার মতন ধৃষ্টতা বা যোগ্যতা আমার নেই। আমি একেবারেই সামান্য এক ভাষাকর্মী। প্রতিদিন নুতনভাবে শিখছি।তবে তরুনেরা সবসময় আমার প্রিয়। আমার বন্ধু তারা। আমি তো তরুনদের সঙ্গেই সময় কাটাই। তাদের থেকে শিখিও। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তরুনদের কে এটুকুই কেবল বলব, প্রচুর পড়াশোনা জরুরী, নিজের কাজের প্রতি সমর্পন জরুরী। ভেতরের চোখটা কে শান দিতে হবে নিয়মিত। আর ডুবে যেতে হবে অন্তহীন জীবনের আকুলিবিকুলির মধ্যে তুমুল। মঞ্চ মাইক প্রচার দরকার নেই। সে সময় হলেই আসবে।আমি তারুণ্যকে সম্মান করি। তারাই আমার সবুজ অহঙ্কার।
সোনালিদিঃ মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে। কিছু শূন্যতা থাকে। তোমার কবি জীবনের সফল স্বপ্নের কথা এবং অধরা স্বপ্নের কথা যদি শেয়ার কর ভাই।
সুবীরঃ আমি এখনো কবি হতে পারিনি, দিদি। এখনো লেখা শিখছি মাত্র। তবে আমার সামান্য জীবনে, ব্যর্থ জীবনে, অবসাদের জীবনে আমি কিন্তু সুখি। আমি আমার যোগ্যতার চেয়েও অনেক পেয়েছি জীবনে। এত এত বর্ণময় প্রান্তিক জনমানুষের ভালবাসা ও সান্নিধ্য আমার সেরা অর্জন। মাসুদারের মতন অনন্ত বন্ধু, খালিদের মতন ভাই, লালনের মতন মায়াময় স্বজন, খোরসেদ ভাইয়ের মতন মানুষ, নদীর মাঝি, ভ্যানয়াল ভাই, লোকশিল্পীরা, বান্ধে ওরাউ, টুনুমুনু এক্কা, ভুষণ করাতী, চিলবানুস তিরকে এবং অজস্র তরুণ বন্ধুরা আমার জীবনের শ্রেষ্ট প্রাপ্তি। ভালো শিক্ষক পেয়েছি, ভাল ছাত্রছাত্রী পেয়েছি। রাহেল রাজিব ও জাকির তালুকদারদের সান্নিদ্ধ আমাকে সুখি হতে শিখিয়েছে।তোমার মতন অসম্ভব পুর্বজন্মের এক দিদিভাই। প্রচুর ভালো ভালো বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি জীবনে। জুটেছে প্রানের মতন বান্ধবীরাও। আমার জীবন তাই প্রাচুর্যে ভরা। আমার জীবন জমজমাট। ভালো লাগে এটাও যে আমার প্রচুর নিন্দুকও রয়েছেন। আমাকে নিয়ে কত প্রচলিত কুৎসার মিথ। এসকল আমি বেশ তরিয়ে তরিয়ে উপভোগ করি। আমি স্বপ্ন দেখি কবিতাগ্রামের। মানুষের যৌথতার। নাচগানের।হাটের ধুলো মেখে ঘরফেরত মানুষদের ধুলোমাখা শরীরের গন্ধের। বাঁচা আর দূরন্ত এক বেঁচেবর্তে থাকবার আবহমানতার। আমার একটা স্বপ্ন রয়েছে দিদি যা এখনো পুর্ণ হয় নি। সে তা হল, একটা খামারবাড়ি আর সাদা ঘোড়া, যার পিঠে চেপে মাথায় লোকশিল্পিদের নির্মিত টুপি পড়ে আমি টপকে যাবো, টপকাতেই থাকবো সব ও সমস্ত আঞ্চলিক নদী। আর আমাকে জাপটে ধরবে চাঁদ ও অন্ধকারও।
সোনালি বেগমঃ বাংলা সাহিত্যের সাথে অনেকদিন ধরেই ভালোভাবে যুক্ত আছো। কবিতা ও গদ্য দুইই সমান্তরালে লিখে চলেছো। এই যে এতদিন ধরে লিখছো, তোমার লেখনিকে প্রভাবিত করেছে এমন এক বা একাধিক ভাললাগা মূহুর্তের কথা যদি শেয়ার কর।
সুবীর সরকারঃ আসলে আমি একটা বর্ণময় ও অলৌকিক বাল্যকাল পেয়েছিলাম। গান ও নাচের সে এক দিন-দুনিয়া। লোকজীবনের মায়ায় বেড়ে উঠছিলাম। আর গ্রামের বাড়িতে পিতামহ পিতামহী জ্যাঠামশাইয়ের কাছে নানান সব গাথা ও গল্প শুনেছিলাম। সে সব আমাকে স্বপ্ননির্মাণ করতে উস্কে দিয়েছিল। আমার পিতামহ রামায়ণ মহাভারত পড়তেন রোজ বিকেলে। প্রচুর পাড়াপড়শি আসতেন। সুর করে পড়তেন। দুলতেন। সে সব আমাকে সংক্রামিত করতো। আর জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে যেতাম বাড়ির পাশের চা-বাগান ও চিলাপাতার জঙ্গলে।ফেউ এর ডাক শুনতাম। কখনো মধ্যরাতে হাতির পাল ঢুকতো আমাদের ধানক্ষেতে। আমি হাতি তাড়াবার দলে ভিড়ে যেতাম। আর ভাই বোনেরা মিলে খেলতাম নানান গ্রামীণ খেলা। মথুরায় বড় হাট বসে সোমবারে। সারাদিন ঘুরতাম হাটের অন্দরে কন্দরে। কত কত বিচিত্র মানুষ দেখতাম। চা-বাগানের মদেশিয়া কামিন্দের দেখতাম। মোরোগলড়াই। পাশা খেলা। এই সব অবচেতনে আমাকে লেখার জীবনে, অভিশাপের জীবনে টেনে এনেছে ।
সোনালিদিঃ internet-এ অসংখ্য web magazine তোমার লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছে। মুদ্রিত ম্যাগ আর web magazine-এর কবিতা। তোমার কিছু বলার আছে কি?
সুবীরঃ আসলে বালিশে আরাম করে পত্রিকা পড়া আমার খুব প্রিয়। কিন্তু এটাও দেখবার যে মুদ্রিত ম্যাগ ৩০০ কপি ছাপা হয়। সেখানে পাঠক সীমাবদ্ধ। কিন্তু web magazine সারা জায়গার পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারে। কাজেই web magazine ও মুদ্রিত ২ টিই আমার কাছে গুরুত্ব পায়।
সোনালিদিঃ তুমি কবিতা লেখো কেন? কবিতার জন্ম তোমার কাছে কিভাবে হয়? তাৎক্ষণিক, না কি ভেবেচিন্তে?
সুবীরঃ না না। আমি বিশ্বাস করি তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা লেখা যায় না। ভেবেচিন্তেও না। আসলে কবিতা জড়িয়েই তো বাঁচি আমি। থাকি আমি। কবিতাকে আসতে দেই আগে। তারপর…শুরুয়াত…আর কবিতা লিখি কেন…তার কোন উত্তর হয় না…হয়তো এটুকুই পারি আমি। মানে কবিতা লেখার প্রয়াস…
সোনালিদিঃ কবিতায় পোষ্ট মডার্নিজম কিভাবে দেখো? তুমি কি কখনো তোমার কবিতায় POST MODERN চিহ্নগুলি খুঁজে পেয়েছো? বা ব্যাবহারে উৎসাহবোধ করেছো?
সুবীরঃ আসলে আমি সেভাবে ভেবে তো কোন তত্ত্বকে অনুসরণ করি না। তবে POST MODERN এর বহুরৈখিকতাকে আমি আমার কবিতায় আনবার আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়েছি বারবার। কিন্তু কখনোই আমি POST MODERN ঘরাণার কবি নই। আমি বিশ্বাস করি কবি তার নিজের মতন লিখবেন। কোন তত্ত্বকে অনুসরণ না করে।
সোনালিদিঃ তোমার কবিতা প্রবাহিত নদীর মতন, কিংবা উদার নীল আকাশের মত সহজ-সরল প্রকৃতি, প্রেম ঠাসা। এই যে জীবনবোধ__কি বলবে তুমি।
সুবীরঃ আসলে বাল্য থেকেই আমায় একটা প্রশ্ন কুড়ে কুরে খায়। সেটা হল…’আচ্ছা, মানুষ বেঁচে থাকে কেন? আস্ত এক জীবন নিয়ে কি করে মানুষ’! এই জিজ্ঞাসা তুমুল তাড়িত করেছে আমাকে সবসময়। না কি স্মৃতি থেকে পালাতে চায় মানুষ! এই সব আমাকে বিক্ষত করে। আর আমি কবিতায় নিজেকে ডুবিয়ে দেই।
সোনালিদিঃ সময়সুযোগ পেলেই উত্তরবঙ্গের নানান জায়গা অথবা বাংলাদেশ ঘুরতে যাওয়া,তোমার নামের সঙ্গে একদম সমার্থক হয়ে উঠেছে। কি সেই ভালোবাসা যা তোমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় – একটু বল।
সুবীরঃ আসলে আমি খুব জমজমাট একটা জীবন যাপন করতে চাই। খুব ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে । মানুষজন জনপদ আঞ্চলিক নদী নিসর্গ হাটগঞ্জ প্রান্তিকজনমানুষের পৃথিবী প্রবল টানে আমাকে। আমার উত্তরজনপদ আমাকে আঁকড়ে থাকে। আর বাংলাদেশে আমার বন্ধুরা আছেন, বাংলাদেশের প্রকৃতির স্নিগ্ধতার এক মায়া আছে, ওখানকার তীব্র আন্তরিকতার টানে আমি বাংলাদেশে যাই। ঘুরে বেড়াই। কোন কবিতা পাঠের আসরের টানে কিন্তু যাই না। এই যাপনটাই তো আমাকে পূর্ণ করে, তাড়িত করে, শুদ্ধ করে। উস্কে দেয় তুমুলও।
সোনালিদিঃ অবসর সময় কীভাবে কাটাতে চাইবে? পরিবার, বন্ধু নাকি কবিতা লেখা?
সুবীরঃ পরিবার,বন্ধু ও কবিতার মধ্যে তো কোন ব্যাবধান বা বিরোধ নেই। আমি তুমুল বোহেমিয়ান আবার প্রবল পারিবারিক। তবে আমার সবসময়ই ব্যস্ততা আবার সর্বদাই অবসর। যাই হোক…পড়া আর পড়া, গান শোনা আর ঘুরে বেড়ানোর জীবনেই আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি।আর পরিবার তো আমার কাছে বটগাছের ছায়ার আর মায়ার আরাম।
সোনালিদিঃ বর্তমানে সাহিত্যের তথ্যপ্রযুক্তির যুগ চলছে। তুমি কতটা আশাবাদী।
সুবীরঃ তথ্যপ্রযুক্তিকে আমি আশীর্বাদ বলে মনে করি। স্বাগত জানাই। সাহিত্যে তথ্যপ্রযুক্তিকে না ব্যবহার করতে পারলে তো অনেক পেছনে পরে থাকতাম আমরা। সাহিত্যের পাঠক, নানান প্রান্তের চর্চার খবর, বিশ্বের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ মিলতো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে তথ্যপ্রযুক্তির কাছে ঋণী। লাটিন আমেরিকার পাশাপাশী বাংলাদেশ অসম ত্রিপুরার সাম্প্রতিক সাহিত্য চর্চার খবর কি জানতে পারতাম তথ্যপ্রযুক্তি না থাকলে! এখন প্রচুর ভালো বইএর সফট কফি পাওয়া যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির জন্যই। তো, আমি চূড়ান্ত আশাবাদী।
সোনালিদিঃ বর্তমানে যে সমস্ত তরুন লেখকেরা লিখছেন,তাদের জন্য কোন বার্তা দিতে চাও?
সুবীরঃ কাউকে বার্তা দেবার মতন ধৃষ্টতা বা যোগ্যতা আমার নেই। আমি একেবারেই সামান্য এক ভাষাকর্মী। প্রতিদিন নুতনভাবে শিখছি।তবে তরুনেরা সবসময় আমার প্রিয়। আমার বন্ধু তারা। আমি তো তরুনদের সঙ্গেই সময় কাটাই। তাদের থেকে শিখিও। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তরুনদের কে এটুকুই কেবল বলব, প্রচুর পড়াশোনা জরুরী, নিজের কাজের প্রতি সমর্পন জরুরী। ভেতরের চোখটা কে শান দিতে হবে নিয়মিত। আর ডুবে যেতে হবে অন্তহীন জীবনের আকুলিবিকুলির মধ্যে তুমুল। মঞ্চ মাইক প্রচার দরকার নেই। সে সময় হলেই আসবে।আমি তারুণ্যকে সম্মান করি। তারাই আমার সবুজ অহঙ্কার।
সোনালিদিঃ মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে। কিছু শূন্যতা থাকে। তোমার কবি জীবনের সফল স্বপ্নের কথা এবং অধরা স্বপ্নের কথা যদি শেয়ার কর ভাই।
সুবীরঃ আমি এখনো কবি হতে পারিনি, দিদি। এখনো লেখা শিখছি মাত্র। তবে আমার সামান্য জীবনে, ব্যর্থ জীবনে, অবসাদের জীবনে আমি কিন্তু সুখি। আমি আমার যোগ্যতার চেয়েও অনেক পেয়েছি জীবনে। এত এত বর্ণময় প্রান্তিক জনমানুষের ভালবাসা ও সান্নিধ্য আমার সেরা অর্জন। মাসুদারের মতন অনন্ত বন্ধু, খালিদের মতন ভাই, লালনের মতন মায়াময় স্বজন, খোরসেদ ভাইয়ের মতন মানুষ, নদীর মাঝি, ভ্যানয়াল ভাই, লোকশিল্পীরা, বান্ধে ওরাউ, টুনুমুনু এক্কা, ভুষণ করাতী, চিলবানুস তিরকে এবং অজস্র তরুণ বন্ধুরা আমার জীবনের শ্রেষ্ট প্রাপ্তি। ভালো শিক্ষক পেয়েছি, ভাল ছাত্রছাত্রী পেয়েছি। রাহেল রাজিব ও জাকির তালুকদারদের সান্নিদ্ধ আমাকে সুখি হতে শিখিয়েছে।তোমার মতন অসম্ভব পুর্বজন্মের এক দিদিভাই। প্রচুর ভালো ভালো বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি জীবনে। জুটেছে প্রানের মতন বান্ধবীরাও। আমার জীবন তাই প্রাচুর্যে ভরা। আমার জীবন জমজমাট। ভালো লাগে এটাও যে আমার প্রচুর নিন্দুকও রয়েছেন। আমাকে নিয়ে কত প্রচলিত কুৎসার মিথ। এসকল আমি বেশ তরিয়ে তরিয়ে উপভোগ করি। আমি স্বপ্ন দেখি কবিতাগ্রামের। মানুষের যৌথতার। নাচগানের।হাটের ধুলো মেখে ঘরফেরত মানুষদের ধুলোমাখা শরীরের গন্ধের। বাঁচা আর দূরন্ত এক বেঁচেবর্তে থাকবার আবহমানতার। আমার একটা স্বপ্ন রয়েছে দিদি যা এখনো পুর্ণ হয় নি। সে তা হল, একটা খামারবাড়ি আর সাদা ঘোড়া, যার পিঠে চেপে মাথায় লোকশিল্পিদের নির্মিত টুপি পড়ে আমি টপকে যাবো, টপকাতেই থাকবো সব ও সমস্ত আঞ্চলিক নদী। আর আমাকে জাপটে ধরবে চাঁদ ও অন্ধকারও।

